আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বেইজিং: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা নদীর সামগ্রিক পানি বণ্টন এবং অববাহিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ‘তিস্তা নদী সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ (টিআরসিএমআরপি)-এ চীনের প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ও কারিগরি সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের মনে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে নয়াদিল্লির এই কড়া নজরদারি ও আপত্তির মাঝেই বেইজিং ঢাকা-বেইজিং যৌথ নদী উন্নয়ন প্রকল্পে নিজেদের পূর্ণ সমর্থন ও অটল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সাথে ঢাকাকে আশ্বস্ত করে চীন স্পষ্ট জানিয়েছে, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক উন্নয়নমূলক সহযোগিতা যেন কোনোভাবেই কোনো তৃতীয় পক্ষের অযাচিত হস্তক্ষেপ বা প্রভাবের শিকার না হয়। বিখ্যাত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘এনডিটিভি’ (NDTV) এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ভূ-রাজনৈতিক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ভারতের উদ্বেগ এবং বেইজিংয়ের কড়া বার্তা
তিস্তা নদী অববাহিকাটি ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং কৌশলগত সীমান্ত এলাকার খুব কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায়, সেখানে চীনের উপস্থিতি ভারতের জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ভারতের এই তীব্র উদ্বেগের বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে বেইজিং অত্যন্ত কূটনৈতিক কিন্তু দৃঢ় অবস্থান প্রদর্শন করে।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরের দিলরুবায় নসিমনের ধাক্কায় সিএনজি উল্টে চালকসহ আহত ৫: হাসপাতালে আশঙ্কাজনক ২
নয়াদিল্লির উদ্বেগকে সরাসরি একপাশে সরিয়ে রেখে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বেইজিংয়ের আনুষ্ঠানিক অবস্থান বুলেট আকারে তুলে ধরেন:
তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়: বেইজিং অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে স্পষ্ট করতে চায় যে, চীন এবং বাংলাদেশের মধ্যে চলমান সমস্ত প্রকার অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক পারস্পরিক সহযোগিতা কোনো নির্দিষ্ট তৃতীয় পক্ষকে (ভারতকে ইঙ্গিত করে) লক্ষ্য করে বা তাদের ক্ষতি করতে পরিচালিত হচ্ছে না।
হস্তক্ষেপমুক্ত সম্পর্ক: ঢাকা এবং বেইজিংয়ের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক যেকোনো কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও যৌথ প্রকল্প সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং এটি যেকোনো ধরনের তৃতীয় পক্ষের বাহ্যিক প্রভাব, চাপ কিংবা নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়।
সাধ্যমতো সহায়তার প্রতিশ্রুতি: তিস্তা নদীর সামগ্রিক পুনরুদ্ধার ও অববাহিকা উন্নয়ন মূলত একটি নিখাদ জনকল্যাণমূলক এবং পরিবেশবান্ধব দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প, যা বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও আপামর জনগণের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জনহিতকর উদ্যোগ সফল করতে চীন তার সাধ্যের সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
শিলিগুড়ি করিডর ও ভারতের নিরাপত্তা আতঙ্ক
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং এনডিটিভির রাজনৈতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা নদীকে ঘিরে বাংলাদেশ ও চীনের এই বিশাল যৌথ মহাপরিকল্পনার ওপর ভারত সুদীর্ঘ সময় ধরে কড়া নজরদারি রাখছে। নয়াদিল্লির এই আশঙ্কার মূল কারণগুলো নিচে আলাদা আলাদা লাইনে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
চিকেনস নেক বা শিলিগুড়ি করিডর: তিস্তা নদীর ভৌগোলিক অবস্থানটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্তকারী অত্যন্ত সরু এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল ‘শিলিগুড়ি করিডর’ বা ‘চিকেনস নেক’ এর একদম কাছাকাছি।
কৌশলগত দুর্বলতার ভয়: ভারতের সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিকেনস নেকের নিকটবর্তী কোনো আন্তর্জাতিক নদীতে বাইরের কোনো পরাশক্তি, বিশেষ করে চীনের সরাসরি উপস্থিতি বা প্রভাব বৃদ্ধি পেলে তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদী হুমকি ও কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করতে পারে।
আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কা: চীন যদি এই পানি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে, তবে তা সামগ্রিকভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ-চীন সমঝোতা ও কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই
ভারতের এই সমস্ত বহুমুখী উদ্বেগের মাঝেই বাংলাদেশ সরকার দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিপুল জনগণের পানির সংকট দূরীকরণ এবং খরা-বন্যা নিয়ন্ত্রণে তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দেশের তিস্তাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকা এবং বেইজিং ইতিমধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সমঝোতা স্মারকে (MoU) পৌঁছেছে।
আরও পড়ুন: তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত হচ্ছে দুদকের জাল: এবার ইউনিয়ন স্তরেও ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান যে, এই প্রথম দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় নদী ও পানি বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে প্রকল্পটির ওপর একটি সুগভীর ও আধুনিক কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই (Technical Feasibility Study) পরিচালনা করতে যাচ্ছেন। চীন সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, এই যৌথ কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের চূড়ান্ত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই বেইজিং এই মেগা প্রকল্পে সম্ভাব্য সব ধরনের আর্থিক অনুদান ও আধুনিক যন্ত্রপাতির জোগান দেবে।
চীনের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন তাঁর বক্তব্যের শেষ অংশে বলেন, "বাংলাদেশ আমাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত অর্থনৈতিক অংশীদার। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সাথে চীনের নিজস্ব উন্নয়ন রূপরেখার আরও বৃহত্তর ও গভীর সমন্বয় সাধনে বেইজিং সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, অর্থনীতি, আধুনিক পানিসম্পদ উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা এবং জনকল্যাণের মতো সুনির্দিষ্ট খাতগুলোতে দ্বিপাক্ষিক বিনিময় ও যৌথ সহযোগিতা আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।" এই দুই দেশের মেলবন্ধন দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পরিবেশবিদরা।
নিউজের সূত্র: ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV) ও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিং।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।