আন্তর্জাতিক ডেস্ক: Shamil হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপে শক্তিশালী এক ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে, যার রিখটার স্কেলে তীব্রতা ছিল ৬.৫ মাত্রা।
মিন্দানাও দ্বীপে ভূগর্ভস্থ শক্তিশালী কম্পন: ফিলিপাইনে আঘাত হানল ৬.৫ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্প, আফটারশকের আশঙ্কায় আতঙ্কে ঘরছাড়ো হাজারো মানুষ
প্রাকৃতিক দুর্যোগের অন্যতম অভয়ারণ্য এবং ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল দেশ ফিলিপাইনে আবারও এক শক্তিশালী ও বড় ধরণের ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্যতম প্রধান দ্বীপ মিন্দানাওয়ে (Mindanao) এই ভূকম্পন অনুভূত হয়, যা রিখটার স্কেলে বেশ শক্তিশালী ক্যাটাগরির হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আকস্মিক এই তীব্র কম্পনের ফলে সমগ্র অঞ্চলের বহুতল ভবন, ঘরবাড়ি ও সাধারণ অবকাঠামো কেঁপে উঠলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই প্রাণভয়ে রাতের অন্ধকারে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা জায়গায় এবং রাস্তায় এসে আশ্রয় নেন। ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, এর উৎপত্তিস্থল থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরবর্তী শহর ও জনপদগুলোও তীব্রভাবে কেঁপে ওঠে।
আজ শুক্রবার (২৬ জুন ২০২৬) তুরস্কের সরকারি ও আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি (Anadolu Agency) তাদের এক বিশেষ বুলেটে ফিলিপাইনের এই শক্তিশালী ভূমিকম্পের খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করেছে। আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কম্পনটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে আঘাত হেনেছে। তবে প্রাথমিক ধাক্কা কেটে গেলেও চরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার মানুষের মধ্যে সুনামির সুপ্ত আতঙ্ক এবং ঘন ঘন মৃদু আফটারশকের (Aftershock) ভয়ে এক ধরণের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
## ইউএসজিএস-এর কারিগরি রিপোর্ট: ভূ-পৃষ্ঠের ৫২.৪ কিমি গভীরে ছিল ভূমিকম্পের মূল কেন্দ্রস্থল
বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ভূমিকম্প ও ভূগর্ভস্থ গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রতিষ্ঠান ইউএসজিএস তথা মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (United States Geological Survey) এই ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট গাণিতিক ও কারিগরি তথ্য সরবরাহ করেছে। ইউএসজিএস-এর রিয়েল-টাইম সিসমোগ্রাফিক ডাটা অনুযায়ী, ফিলিপাইনের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৪ মিনিটে এই শক্তিশালী ভূকম্পনটি আঘাত হানে। রাতে যখন সাধারণ মানুষ ঘরের ভেতরে দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখনই মাটির নিচ থেকে এক তীব্র ঝাঁকুনি অনুভূত হয়।
আরও পড়ুন: বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ সিটিক টাওয়ারে বিমান আছড়ে পড়ার ঘটনা, ১০৯ তলা ভবনে তীব্র আতঙ্ক
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এই শক্তিশালী ভূমিকম্পটির মূল উৎপত্তিস্থল বা এপিসেন্টার (Epicenter) ছিল ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ দাভাও অক্সিডেন্টালের সারাঙ্গানি (Sarangani, Davao Occidental) নামক দ্বীপ অঞ্চলের অত্যন্ত নিকটবর্তী একটি সামুদ্রিক ও উপকূলীয় এলাকায়। সিসমোলজিস্ট বা ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই কম্পনটির গভীরতা ছিল ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫২ দশমিক ৪ কিলোমিটার (52.4 km) গভীরে। ভূগর্ভের এই মধ্যম মাত্রার গভীরতার কারণেই কম্পনটির শক্তি সরাসরি ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়ে এবং বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তীব্র তরঙ্গের সৃষ্টি করে, যার ফলে দাভাও এবং সারাঙ্গানির আশেপাশের বিশাল এলাকা জুড়ে কম্পনের স্থায়ীত্ব বেশ কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল।
## ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক খতিয়ান: হতাহতের খবর না থাকলেও জারি রয়েছে বিশেষ সতর্কতা
তুর্কি সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুসারে, ভূমিকম্পটি অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও ভৌগোলিক অবস্থান এবং উপকূলীয় গভীরতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ধরনের বড় অংকের বড় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য মেলেনি। এছাড়া কোনো নাগরিকের প্রাণহানি কিংবা গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাত পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়নি। তবে প্রত্যন্ত দ্বীপ এবং উপকূলীয় গ্রামগুলোর ভেতরের প্রকৃত চিত্র কেমন, তা জানতে ফিলিপাইনের স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা কাজ শুরু করেছেন।
ফিলিপাইনের স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক সংস্থা ফিলভলকস (PHIVOLCS) জানিয়েছে যে, ৬.৫ মাত্রার মতো শক্তিশালী একটি ভূকম্পনের পর সাধারণত পরবর্তী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত ওই অঞ্চলে একাধিক আফটারশক বা মৃদু অনুকম্পন আঘাত হানতে পারে। আর সেই কারণেই দাভাও অক্সিডেন্টাল এবং সারাঙ্গানি প্রদেশের সমস্ত বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো দুর্বল বা ফাটল ধরা ভবনে আপাতত প্রবেশ না করার জন্য সাধারণ নাগরিকদের মাইকিং করে সচেতন করছে দেশটির উদ্ধারকারী দল।
## অতীত স্মৃতির দগদগে ক্ষত: গত ৮ জুনের ৭.৮ মাত্রার প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি
মিন্দানাও দ্বীপে আজকের এই ৬.৫ মাত্রার ভূমিকম্পটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে মাত্র কয়েকদিন আগের এক ভয়াবহ ও প্রলয়ঙ্কারী দুর্যোগের দগদগে ক্ষতকে আবারও নতুন করে তাজা করে তুলেছে। এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে অর্থাৎ গত ৮ জুন ২০২৬ তারিখে এই মিন্দানাওয়ের সারাঙ্গানি প্রদেশের উপকূলেই এক প্রলয়ঙ্কারী ও দানবীয় ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। ৭.৮ মাত্রার সেই প্রলয় কাণ্ডে ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে এক অভূতপূর্ব ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হয়েছিল।
বিগত ৮ জুনের সেই ভয়াবহ ভূমিকম্পের মূল ধ্বংসলীলার খতিয়ান ছিল নিম্নরূপ:
নিহতের সংখ্যা: শক্তিশালী সেই কম্পন ও ধসের কারণে অন্তত ৭৮ জন মানুষ নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা: সমগ্র অঞ্চল জুড়ে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ সরাসরি বাস্তুচ্যুত ও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।
অবকাঠামোগত ক্ষতি: হাজার হাজার ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল এবং উপকূলীয় রাস্তাঘাট ও সেতু ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
সেই ভয়াবহ দুর্যোগের ধকল ও মানসিক ট্রমা কাটিয়ে ওঠার আগেই আজ ২৬ জুন আবারও একই এলাকায় ৬.৫ মাত্রার শক্তিশালী কম্পন আঘাত হানায় চরের সাধারণ মানুষের মধ্যে মানসিক আতঙ্ক চরম আকার ধারণ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, ভূগর্ভের ফল্ট লাইনগুলো হয়তো নতুন কোনো বড় ধরণের ফাটলের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: নতুন প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট লঞ্চারের সফল পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া
## একনজরে ফিলিপাইনের আজকের শক্তিশালী ভূমিকম্পের মূল বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি তথ্য
পাঠকদের সুবিধার্থে এবং ফিলিপাইনে আঘাত হানা এই শক্তিশালী ভূকম্পনের মূল বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি দিকসমূহ একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি প্রфেশনাল ও আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:
| ভূমিকম্পের প্রধান প্রধান প্যারামিটারসমূহ | ইউএসজিএস ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সুনির্দিষ্ট খতিয়ান |
| ১. ভূমিকম্পের তীব্রতা (Magnitude) | রিখটার স্কেলে ৬.৫ মাত্রা (শক্তিশালী ক্যাটাগরি)। |
| ২. আঘাত হানার সুনির্দিষ্ট তারিখ | ২৬ জুন ২০২৬ (শুক্রবার)। |
| ৩. সুনির্দিষ্ট স্থানীয় সময় | ফিলিপাইনের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৪ মিনিট। |
| ৪. ভূগর্ভস্থ গভীরতা (Depth) | ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫২.৪ কিলোমিটার গভীরে। |
| ৫. ভূমিকম্পের মূল কেন্দ্রস্থল (Epicenter) | দাভাও অক্সিডেন্টালের সারাঙ্গানির নিকটবর্তী এলাকা। |
| ৬. প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র | তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে আফটারশকের সতর্কতা জারি। |
| ৭. ভৌগোলিক ভৌতিক অবস্থান | প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অত্যন্ত বিপজ্জনক প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার। |
## ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’ এবং ফিলিপাইনের চিরস্থায়ী ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের রহস্য
ফিলিপাইনে কেন এত ঘন ঘন শক্তিশালী ভূমিকম্প, সুনামি ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো প্রলয়ঙ্কারী ঘটনা ঘটে, তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে এর ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় ফিলিপাইন রাষ্ট্রটি বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং টেকটোনিকালি সক্রিয় অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’ (Pacific Ring of Fire) বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয়ের ওপর অবস্থিত। ঘোড়ার খুরের আকৃতির এই বিশাল অঞ্চলটি প্রশান্ত মহাসাগরকে বেষ্টন করে রেখেছে, যেখানে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ভূমিকম্প এবং ৭৫ শতাংশেরও বেশি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি অবস্থান করছে।
এই অগ্নিবলয়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিশাল ও ক্ষুদ্র টেকটোনিক প্লেট—যেমন প্যাসিফিক প্লেট, ফিলিপাইন সী প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেট অনবরত একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে এবং একটি অপরটির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এই প্লেটগুলোর অনবরত ঘর্ষণ ও স্থানচ্যুতির কারণেই ফিলিপাইনের ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা হয় এবং তা হঠাৎ করেই ভূমিকম্পের তরঙ্গ হিসেবে বাইরে বেরিয়ে আসে। আর এই ভূ-প্রাকৃতিক কারণেই ফিলিপাইনকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুর্যোগপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে প্রতি বছরই শত শত মৃদু ও মাঝারি কম্পন রেকর্ড করা হয়ে থাকে।
বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া প্রতিটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর, জলবায়ু পরিবর্তনের আন্তর্জাতিক আপডেট, ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের ভূমিকম্প পরবর্তী লাইভ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিমণ্ডলের প্রতিটি নির্ভরযোগ্য খবরাখবর সবার আগে শতভাগ ইউনিক ও প্রফেশনাল উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।