আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ওয়াশিংটন: রহস্যময়ী উপগ্রহ চাঁদের বুকে মানুষের স্থায়ী বসতি বা আন্তর্জাতিক ঘাঁটি নির্মাণের ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক অভিযানে এবার আরও একধাপ সফলতার সাথে এগিয়ে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)। গত মঙ্গলবার এক বিশেষ ওয়াশিংটন সদর দপ্তরের প্রেস ব্রিফিংয়ে সম্পূর্ণ নতুন করে বেশ কিছু অত্যাধুনিক ও মানুষবিহীন স্বয়ংক্রিয় চন্দ্র অভিযানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে আমেরিকার এই শীর্ষ মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। বিগত কয়েক মাসে নাসার এই মহাকাশ প্রজেক্টে বেশ কিছু অভাবনীয় কারিগরি জটিলতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা-বিপত্তি এলেও বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সেই বিশাল ও স্বপ্নের প্রকল্পটি এখন আর কল্পবিজ্ঞানের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ধীরে ধীরে বাস্তবতায় রূপ নিতে শুরু করেছে। চাঁদের রুক্ষ ও বৈরী পরিবেশে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করার লক্ষ্যে নাসা এখন অত্যন্ত সুসংগঠিত উপায়ে তাদের পরবর্তী মিশনগুলোর রোডম্যাপ সাজাচ্ছে, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য মহাকাশ বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
নাসার অফিশিয়াল তথ্য বিবরণী থেকে জানা গেছে যে, চাঁদের মাটিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় জটিল যন্ত্রপাতি, ল্যান্ডার ও রোভারসহ মহাকাশচারীদের জীবনধারণের বিভিন্ন অতি প্রয়োজনীয় মালপত্র নিরাপদে পৌঁছানোর জন্য আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় তিনটি বেসরকারি বাণিজ্যিক অ্যারোস্পেস কোম্পানির সাথে এক বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। এই প্রাথমিক লজিস্টিক ও মালপত্র পরিবহনের কাজের জন্য নাসা তাদের নিজস্ব বাজেট থেকে প্রায় ৬০ কোটি মার্কিন ডলার বা তারও বেশি অর্থ এককভাবে খরচ করার বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য ও কৌশল হলো, ভবিষ্যতে চাঁদের বুকে কোনো জীবিত মানুষ বা নভোচারী সশরীরে পা রাখার অনেক আগেই অত্যাধুনিক রোবোটিক প্রযুক্তি এবং এআই চালিত রোবট ব্যবহার করে সেখানে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক সমস্ত ঘরবাড়ি ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো শতভাগ নিখুঁতভাবে তৈরি করে রাখা। এর ফলে মানুষ যখন প্রথমবার চাঁদের ঘাঁটিতে গিয়ে পৌঁছাবে, তখন তাদের একদম শূন্য থেকে কাজ শুরু করতে হবে না, বরং তারা আগে থেকে তৈরি একটি সুরক্ষিত ও নিরাপদ কৃত্রিম বাসস্থান ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
আরও পড়ুন: ডিজিটাল সাফল্যের গোপন চাবিকাঠি: কখন পোস্ট করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ ও রিচ বাড়ে
তবে নাসার এই মহাপরিকল্পনার পথটি সাম্প্রতিক সময়ে একদম মসৃণ ছিল না, কারণ বিশ্বখ্যাত মার্কিন প্রযুক্তি ধনকুবের জেফ বেজোসের মালিকানাধীন জনপ্রিয় রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ব্লু অরিজিন’-এর তৈরি অত্যাধুনিক ‘নিউ গ্লেন’ নামক রকেটে উৎক্ষেপণের প্রস্তুতির সময় একটি বড় ধরনের আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটে। এই অপ্রত্যাশিত ও বড় রকেট বিস্ফোরণের ঘটনার ফলে নাসার পরিকল্পিত চন্দ্র অভিযানের সময়সূচিতে একটি বড় ধাক্কা লাগে এবং প্রকল্পটি সাময়িকভাবে কিছুটা বাধার সম্মুখীন হয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে নাসার উচ্চপদস্থ মিশন কর্মকর্তা কার্লোস গার্সিয়া-গালান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, এই আকস্মিক রকেট বিপর্যয়ের পরও তারা ব্লু অরিজিন কোম্পানির কারিগরি দলের সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ও যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছেন যাতে দুর্ঘটনার মূল কারণ অনুসন্ধান করে রকেটের নকশা আরও নিরাপদ করা যায়। এর পাশাপাশি দূরদর্শী মার্কিন মহাকাশ সংস্থাটি কোনো বিশেষ কারণে এই চন্দ্র অভিযানে আরও অতিরিক্ত দেরি বা বিলম্ব এড়াতে আগে থেকেই বিকল্প রকেট ও বিকল্প স্পেস শাটলের চমৎকার উপায়ও সম্পূর্ণ প্রস্তুত ভেবে রেখেছেন।
এখানে অত্যন্ত স্মরণীয় যে, গত মার্চ মাসে নাসা তাদের দীর্ঘদিনের পুরোনো চন্দ্র অভিযানের মূল স্ট্র্যাটেজি ও মহাকাশ পরিকল্পনা কিছুটা আমূল পরিবর্তন করার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর আগে তাদের মূল পরিকল্পনা ছিল চাঁদের চারপাশের কক্ষপথে একটি স্পেস স্টেশন বা গেটওয়ে তৈরি করা, কিন্তু বর্তমানে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে তারা চাঁদের কক্ষপথের বদলে সরাসরি চাঁদের মাটির ওপর বা লুনার সারফেসে একটি স্থায়ী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মানব ঘাঁটি বানানোর দিকে নিজেদের সমস্ত নজর ও প্রযুক্তিগত শক্তি নিবদ্ধ করেছে। এই বিশাল ও মানব ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল বৈজ্ঞানিক উদ্যোগে মার্কিন প্রশাসন প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের বড় প্রতিশ্রুতি ও আইনি অনুমোদন প্রদান করেছে।
আরও পড়ুন: ইসলামের মানদণ্ডে আসল প্রাজ্ঞ কে? জেনে নিন নবীজির (সা.) খাঁটি বুদ্ধিমানের সংজ্ঞা
নাসার বিজ্ঞানীরা গবেষণার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, চাঁদের চারপাশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় চাঁদের দক্ষিণ মেরুর (South Pole) কাছাকাছি একটি দুর্গম কিন্তু অত্যন্ত কৌশলগত এলাকায় এই স্থায়ী মানব ঘাঁটিটি নির্মাণ করা হবে। কারণ হিসেবে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুর চির অন্ধকারাচ্ছন্ন গহ্বরগুলোর ভেতরের মাটিতে প্রচুর পরিমাণে বরফ বা জমাটবদ্ধ পানি লুকায়িত আছে, যা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নভোচারীদের পানীয় জলের চাহিদা মেটাবে এবং তা থেকে রকেটের তরল জ্বালানি বা হাইড্রোজেন তৈরি করা সম্ভব হবে। নাসা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, ২০২৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে চাঁদের মাটিতে এই আন্তর্জাতিক মানব ঘাঁটির মূল নির্মাণকাজ বা কনস্ট্রাকশনের কাজ পুরোদমে শুরু হয়ে যেতে পারে।
মূলত বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে এশিয়ার পরাশক্তি চীনের সাথে মহাকাশ গবেষণার ইঁদুর দৌড়ে পাল্লা দিতে এবং নিজেদের একক প্রাধান্য ধরে রাখতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাসা এই বিশাল চন্দ্র ঘাঁটি নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কারণ চীনও তাদের নিজস্ব মহাকাশ কর্মসূচির আওতায় আগামী দিনগুলোতে চাঁদের মাটিতে নিজস্ব নভোচারী পাঠানো এবং সেখানে একটি স্থায়ী রোবোটিক ও মানব ঘাঁটি বানানোর জন্য সমান্তরাল পরিকল্পনা নিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কাজ করে যাচ্ছে। চাঁদের তীব্র ঠান্ডা, ক্ষতিকর রেডিয়েশন বা বিকিরণযুক্ত পরিবেশ নিখুঁতভাবে জরিপ করে সেখানে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের জন্য বিদ্যুতের লাইন বা পাওয়ার গ্রিড স্থাপন এবং মানুষের থাকার ঘর বা লুনার হ্যাবিটেট বানাতে ল্যান্ডার, রোভার ও বিশেষ উড্ডয়ন ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন ব্যবহার করবে নাসা। এই জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী কাজটি অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে সফলভাবে শেষ করার জন্য আমেরিকার বিজ্ঞানীরা এর আগে মঙ্গল গ্রহে পাঠানো একটি অত্যন্ত সফল ও বিখ্যাত রোভারের উন্নত প্রযুক্তির নকশা ও কার্যকারিতাও এই চন্দ্র মিশনে পুনরায় ব্যবহার করার কথা খুব গুরুত্বের সাথে ভাবছেন।
নিউজের সূত্র: ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত নাসার (NASA) প্রধান কার্যালয়ের অফিশিয়াল স্পেস মিশন আর্কাইভ এবং আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী 'স্পেস ডট কম' (Space.com) এর বিশেষ প্রতিবেদন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।