দোহা, কাতার: মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও আধুনিক কাতারের প্রধান রূপকার ও দেশটির সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ৭৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
আজ রবিবার (১২ জুলাই, ২০২৬) সকালে কাতারের রাজকীয় প্রশাসনিক দপ্তর ‘আমিরি দিওয়ান’ থেকে প্রকাশিত একটি বিশেষ ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বিশ্ববাসীকে এই শোক সংবাদটি নিশ্চিত করা হয়েছে। কাতারের এই মহান নেতার আকস্মিক প্রস্থানে শুধু কাতার রাষ্ট্রেই নয়, বরং সমগ্র আরব বিশ্ব তথা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে গভীর শোক ও শ্রদ্ধার ছায়া নেমে এসেছে।
কাতারের রাজকীয় দপ্তর ‘আমিরি দিওয়ান’-এর আনুষ্ঠানিক বার্তা
কাতারের আমিরি দিওয়ানের পক্ষ থেকে দেশ ও জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া অত্যন্ত আবেগঘন ও শোকাবহ বিবৃতিতে বলা হয়েছে:
আরও পড়ুন: মাদারীপুরে থানা থেকে গ্রিল কেটে নারী আসামির পলায়ন: কেরাণীগঞ্জে ধরে পাঠালো কারাগারে
"পরম করুণাময় মহান আল্লাহর ফয়সালা, অমোঘ বিধান ও পবিত্র তাকদিরের প্রতি অবিচল ঈমান ও গভীর বিশ্বাস রেখে আমিরি দিওয়ান অত্যন্ত দুঃখ ও গভীর শোকের সঙ্গে সমগ্র দেশবাসীকে জাতির এই অপূরণীয় ও ঐতিহাসিক ক্ষতির সংবাদটি সশ্রদ্ধচিত্তে জানাচ্ছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর ওপর অসীম রহমত ও মাগফিরাত বর্ষণ করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। কাতারের সম্মানিত ‘ফাদার আমির’ হিজ হাইনেস শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি আজ রবিবার সকালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।"
আধুনিক কাতার বিনির্মাণে শেখ হামাদের ঐতিহাসিক অবদান
মরহুম শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি কেবল কাতারের একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানই ছিলেন না, বরং তাকে বিবেচনা করা হয় বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও দূরদর্শী দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। তিনি ১৯৯৫ সাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় ধরে অর্থাৎ ২০১৩ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে এবং সফলতার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটির আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর শাসনামলেই মূলত কাতার একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি অনুন্নত ও সাধারণ রাষ্ট্র থেকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির সুদীর্ঘ শাসনকালের কিছু যুগান্তকারী ও স্মরণীয় অবদান নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
জ্বালানি সম্পদের বৈপ্লবিক ব্যবহার: কাতারকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (LNG) রপ্তানিতে বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তিতে পরিণত করার পেছনে মূল অবদান ছিল শেখ হামাদের। তিনি দেশের মাটির নিচে থাকা বিপুল জ্বালানি সম্পদকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজে লাগিয়ে কাতারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলেন।
অবকাঠামোগত আধুনিকায়ন: তাঁর দূরদর্শী নির্দেশনায় কাতার জুড়ে গড়ে ওঠে চোখ ধাঁধানো সব বহুতল ভবন, বিশ্বমানের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, এক্সপ্রেস হাইওয়ে এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসা কেন্দ্র।
কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব: পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাতারকে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট নিরসনে কাতার তাঁর আমলেই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ভূমিকা পালন শুরু করে।
গণমাধ্যমের বিকাশ: বিশ্বজুড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘আল জাজিরা’ (Al Jazeera) নেটওয়ার্ক তাঁর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমেই কাতারের মাটি থেকে যাত্রা শুরু করেছিল।
স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর ও ‘ফাদার আমির’ খেতাব
২০১৩ সালে যখন শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করছিলেন, তখন তিনি বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য ও বিরল নজির স্থাপন করেন। রাজপরিবারের ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার দীর্ঘদিনের আরবীয় প্রথা ভেঙে তিনি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও শান্তিপূর্ণভাবে নিজের রাজকীয় সিংহাসন ত্যাগ করেন।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে রক্তাক্ত ফ্রাইডে: পৃথক স্থানে গৃহবধূ ও নিখোঁজ যুবকের মরদেহ উদ্ধার, স্বামী আটক
তিনি দেশের তরুণ ও আধুনিক নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখে তাঁর সুযোগ্য পুত্র এবং বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির কাছে কাতারের রাষ্ট্র পরিচালনার সম্পূর্ণ পবিত্র দায়িত্ব ও চাবি হস্তান্তর করেন। ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকেই কাতার রাষ্ট্র ও কাতারী জনগণের কাছে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফাদার আমির’ (জাতির পিতা সমতুল্য সম্মানিত আমির) হিসেবে ভূষিত ও পরিচিত ছিলেন।
শেখ হামাদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই সমগ্র কাতার জুড়ে এক গভীর ও স্তব্ধ শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। দেশের সব সরকারি ভবন, রাজকীয় দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কাতারভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে—মরহুম ফাদার আমিরের জানাজার নামাজ, দাফন প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রীয়ভাবে কতদিনের শোক পালন করা হবে, সেই বিষয়ে আমিরি দিওয়ানের পক্ষ থেকে খুব শীঘ্রই সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। বিশ্বনেতারা ইতিমধ্যেই কাতারের বর্তমান আমিরের প্রতি তাদের গভীর সমবেদনা বার্তা পাঠানো শুরু করেছেন।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: কাতার ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা ও আমিরি দিওয়ান প্রেস রিলিজ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।