আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ইউরোপের উন্নত রাষ্ট্র ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত গ্র্যান্ড মস্ক, যেখানে নতুন সরকারি নীতির কারণে লাউডস্পিকারে আজান প্রচারের ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ইউরোপীয় ভূ-রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক: ডেনমার্কে মাইকে আজান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার আইনি রূপরেখা ঘোষণা, অভিবাসন মন্ত্রীর মন্তব্যে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড়
ইউরোপের অন্যতম শান্ত ও উন্নত রাষ্ট্র ডেনমার্কে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করে দেশটিতে ইসলামের অন্যতম পবিত্র ও ঐতিহ্যবাহী আহ্বান ‘আজান’ (Islamic Call to Prayer) বা নামাজের ঘোষণা লাউডস্পিকারে প্রচার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। ডেনমার্কের বর্তমান সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও নীতি-নির্ধারক ব্যক্তিত্ব তথা দেশের অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রী মর্টেন বডসকভ (Morten Bødskov) এই চরমপন্থী ও কঠোর পদক্ষেপের কথা প্রকাশ করেছেন। তবে কেবল নিষেধাজ্ঞা জারির ঘোষণাই নয়, তিনি ডেনমার্কের বেশ কিছু মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাকে এশিয়ার রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাজধানী ‘ইসলামাবাদের কোনো এক সস্তা শহরতলী’ বা উপশহরের সাথে সরাসরি তুলনা করে এক নজিরবিহীন মন্তব্য করেছেন, যা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অন্দরমহল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
আজ শুক্রবার (২৬ জুন ২০২৬) ডেনমার্কের রাষ্ট্রীয় নীতিমালার অংশ হিসেবে এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণাটি সামনে আসে। দেশটির বর্তমান কেন্দ্র-বামপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস পার্টির (Social Democrats Party) অন্যতম শীর্ষ নেতা মর্টেন বডসকভ স্পষ্ট করেছেন যে, নবগঠিত জোট সরকার ডেনমার্কের আকাশসীমায় লাউডস্পিকার বা মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনিকে আইনিভাবে চিরতরে স্তব্ধ করতে চায়। এই লক্ষ্যে এই নিষেধাজ্ঞার আইনি বৈধতা এবং সাংবিধানিক কোনো বাধা আছে কিনা, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে সরকার ইতিমধ্যে উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি ও আইনি পর্যালোচনা দল গঠন করেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ইউরোপে ক্রমবর্ধমান ডানপন্থী ও ইসলামভীতি (Islamophobia) নীতির এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন বহু আন্তর্জাতিক সমাজবিজ্ঞানী।
## ‘ডেনমার্কের ছাদে আজানের সুর ভেসে আসা উচিত নয়’: রিটজৌ-কে দেওয়া মন্ত্রীর এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার
ডেনমার্কের বিখ্যাত ও শীর্ষস্থানীয় জাতীয় বার্তা সংস্থা ‘রিটজৌ’ (Ritzau)-কে দেওয়া এক বিশেষ ও প্রফেশনাল সাক্ষাৎকারে অভিবাসন মন্ত্রী মর্টেন বডসকভ তাঁর এই কট্টর অবস্থানের পেছনের মূল রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শন অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দাবি করেন, ডেনমার্ক একটি ইউরোপীয় সংস্কৃতির দেশ এবং এর নিজস্ব একটি ঐতিহ্য রয়েছে, যা কোনোভাবেই অন্য কোনো বহিরাগত সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত বা ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া যাবে না।
আরও পড়ুন: পাবনায় পদ্মার চরে অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে রণক্ষেত্র, গুলিতে বিএনপি কর্মী মঞ্জু শেখ নিহত
সাক্ষাৎকারে ডেনমার্কের সামাজিক রূপান্তর নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রী মর্টেন বডসকভ অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন:
"আধুনিক ডেনমার্কের আকাশ ও ছাদগুলোর ওপর দিয়ে প্রতিদিন ইসলামের এই আজানের সুর ভেসে আসুক, তা আমরা কোনোভাবেই চাই না এবং এটি হওয়া মোটেও উচিত নয়। ডেনমার্কের সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে এই আজানের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ঐতিহাসিক স্থান নেই। ডেনমার্কের কোনো ঐতিহ্যবাহী রাস্তায় বা ফুটপাতে হাঁটার সময় আমাদের দেশের একজন সাধারণ নাগরিকের মনেও যেন কখনো এমন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সন্দেহের উদ্রেক না হয় যে, তিনি ইউরোপে নেই, বরং সুদূর পাকিস্তানের কোনো এক অনুন্নত ইসলামাবাদের শহরতলীতে চলে এসেছেন। আমাদের জনসমক্ষে আমাদের নিজস্ব ডেনিশ সংস্কৃতির প্রাধান্য বজায় রাখতে হবে।"
মন্ত্রী বডসকভ তাঁর বক্তব্যে আরও দাবি করেন যে, ডেনমার্কে ক্রমান্বয়ে এক ধরণের ছদ্মবেশী 'ইসলামীকরণ' (Islamisation) দানা বেঁধে উঠছে, যা ডেনিশ নাগরিকদের উন্মুক্ত জনপরিসর, রাস্তাঘাট ও সাধারণ মানুষের স্বাধীন স্থানগুলোকে অলক্ষিতভাবে গ্রাস করে নিচ্ছে। আর এই প্রক্রিয়াকে রুখে দেওয়ার জন্যই আজান নিষিদ্ধের মতো কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সময়ের দাবি বলে তিনি মনে করেন।
## কোপেনহেগেনে ইতিমধ্যে কার্যকর কঠোর শব্দদূষণ নীতি: ৬ বছর ধরে দফায় দফায় নিষিদ্ধের চেষ্টা
বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডেনমার্কে আজানের ওপর এমন আক্রমণাত্মক বা কঠোর নীতি এবারই প্রথম নয়। এর আগেও ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনসহ দেশের বেশ কয়েকটি বড় বড় মেগাসিটি ও পৌর এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ও জটিল শব্দদূষণ নীতি (Noise Pollution Policy) কার্যকর করা রয়েছে। এই স্থানীয় পরিবেশগত আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে ডেনমার্কের কোনো মসজিদই বর্তমানে তাদের উচুঁ মিনার কিংবা লাউডস্পিকারে উচ্চ শব্দে আজান প্রচার করতে পারে না। তবে স্থানীয় আইনের বাইরে গিয়ে এবার পুরো রাষ্ট্রজুড়ে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো বা ব্ল্যাক-ল’ তৈরি করতে চাইছে দেশটির সরকার।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ডেনমার্কের আইনসভায় আজান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করার ক্ষেত্রে কোনো অভিবাসন মন্ত্রীর পক্ষ থেকে এটি মূলত তৃতীয় দফার একটি বড়সড় প্রচেষ্টা। এর আগে বিগত ২০২০ সালে এবং অতি সম্প্রতি ২০২৫ সালেও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস পার্টির পক্ষ থেকে দেশটির পার্লামেন্টে আজান এবং মুসলিমদের বাহ্যিক ধর্মীয় আচার বন্ধে প্রায় একই ধরনের আইনি বিল ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে প্রতিবারই তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আইনি লড়াইয়ের মুখে তা আলোর মুখ দেখতে পারেনি। ২০২৬ সালে এসে নতুন জোট সরকারের রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য এই একই ইস্যুকে আবারো নতুন করে দানা বাঁধতে দেওয়া হচ্ছে।
## প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের কট্টর অভিবাসন নীতি: ‘ঘেটো আইন’ ও আশ্রয়প্রার্থীদের সোনা-গহনা জব্দের কালো অধ্যায়
ডেনমার্কের বর্তমান রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশটিতে বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন (Mette Frederiksen)-এর নেতৃত্বে সমগ্র ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর, বিতর্কিত ও নিষ্ঠুর অভিবাসন নীতি (Anti-immigration Policy) বজায় রাখা হয়েছে। মেটে ফ্রেডেরিকসেন চলতি জুনের শুরুর দিকেই এক জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ শেষে তৃতীয় মেয়াদে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তাঁর পূর্ববর্তী দুই মেয়াদেও তিনি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কট্টরপন্থী অবস্থান নিয়েছিলেন, যা মূলত ইউরোপের কট্টর ডানপন্থীদের ভোট ব্যাংকে টান দেওয়ার একটি কৌশল ছিল।
আরও পড়ুন: ন্যায্য অধিকার না দিলে রাজপথে তীব্র লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি বিরোধী দলীয় নেতার
ডেনমার্কের এই চরম অভিবাসী বিরোধী নীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো তাদের তৈরি করা কুখ্যাত "ঘেটো" (Ghetto) আইন। এই বিতর্কিত আইন অনুযায়ী, ডেনমার্কের কোনো নির্দিষ্ট আবাসন এলাকায় বা শহরতলীতে যদি অ-ইউরোপীয় বা বিদেশী নাগরিক ও মুসলিমদের সংখ্যা ডেনিশদের তুলনায় একটি নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে অতিরিক্ত বেশি হয়ে যায়, তবে দেশটির নিরাপত্তা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ চাইলে যেকোনো মুহূর্তে ওই সমস্ত অভিবাসীদের তাদের নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে অন্য কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় সরিয়ে দিতে পারে।
শুধু তাই নয়, ডেনমার্কের আইনি কাঠামো এতটাই কঠোর যে, সেখানে কোনো বিদেশী যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী (Asylum Seekers) হিসেবে প্রবেশ করলে, তাদের ডেনমার্কে থাকার এবং আবাসন খরচ মেটানোর অজুহাতে তাদের সাথে থাকা ব্যক্তিগত সোনা-গহনা, মূল্যবান অলঙ্কার এবং দামী জিনিসপত্র সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বাধ্য করা হয়। এর পাশাপাশি, কোনো আশ্রয়প্রার্থীর আইনি আবেদন যদি ডেনিশ আদালত বা অভিবাসন বিভাগ একবার খারিজ করে দেয়, তবে তাকে কোনো ধরনের মানবিক বা আর্থিক সাহায্য না দিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় ক্যাম্পগুলোতে বন্দি রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালে যখন সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার কারণে ১০ লক্ষাধিক মানুষ ইউরোপের সীমান্তের দিকে পাড়ি জমিয়েছিল, তখনো ডেনমার্ক তার প্রতিবেশী দেশ জার্মানি বা সুইডেনের তুলনায় একেবারে নামমাত্র ও কম সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীকে নিজের দেশে প্রবেশ করতে দিয়েছিল।
## আইনি ও সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার: ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম স্থানীয় অধিকারের দ্বন্দ্ব
যদিও ডেনমার্কের অভিবাসন মন্ত্রী অত্যন্ত জোর গলায় দেশজুড়ে আজান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার মেগা প্ল্যানের কথা ঘোষণা করেছেন, তবে ডেনিশ আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য মোটেও সহজ হবে না। এই মেগা প্রজেক্টটি খুব দ্রুতই দেশের সর্বোচ্চ আদালত ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে এক বিশাল ও জটিল আইনি চ্যালেঞ্জের (Legal Challenges) মুখে পড়তে যাচ্ছে। কারণ, সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটিকে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক আইন ও ডেনিশ ঐতিহ্য অনুযায়ী নাগরিকদের মৌলিক ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে মসজিদের আশেপাশের অমুসলিম বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত অধিকার ও শব্দদূষণের বিষয়টিও ব্যালেন্স করতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ডেনমার্কের নিজস্ব সংবিধানে (Danish Constitution) অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জনসমক্ষে যেকোনো নাগরিকের নিজের ধর্মীয় উপাসনা, আচার-অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয় অনুশাসন পালন করার পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই সাংবিধানিক অধিকারের কিছু ব্যতিক্রমী ধারাও রয়েছে—যেমন কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী যদি গণতন্ত্রবিরোধী প্রচার চালায় বা রাষ্ট্র কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে অর্থ বা অনুদান প্রদান করে, তবে সরকার তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। কিন্তু আজান যেহেতু স্রেফ একটি ধর্মীয় উপাসনার আহ্বান, তাই এটিকে সংবিধানে হাত না দিয়ে সরাসরি আইনি বিল পাসের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা ডেনমার্কের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে বিশ্বমঞ্চে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবে।
আরও পড়ুন: বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার
ইউরোপের অন্যান্য প্রভাবশালী দেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, জার্মানি এবং ব্রিটেনে (যুক্তরাজ্য) মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার ও অমুসলিম প্রতিবেশীদের দৈনন্দিন শান্তির মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সেখানে মসজিদগুলো থেকে আজান প্রচারের সময়, দৈনিক ফ্রিকোয়েন্সি এবং লাউডস্পিকারের শব্দের মাত্রার (Decibel Level) ওপর স্থানীয় প্রশাসনের অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে, যার ফলে ধর্মীয় স্বাধীনতাও ক্ষুণ্ন হয় না এবং প্রতিবেশীদেরও কোনো বিঘ্ন ঘটে না। কিন্তু ডেনমার্ক সেই পথে না হেঁটে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণের পথে হাঁটছে।
## একনজরে ডেনমার্কের মুসলিম জনসংখ্যা, মসজিদ ও আজান নিষিদ্ধের মূল রূপরেখা
পাঠকদের সুবিধার্থে এবং ডেনমার্কের চলমান সামাজিক কাঠামো ও সরকারের বিতর্কিত বিলের মূল দিকসমূহ একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ প্রফেশনাল তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:
| ডেনমার্কের সামাজিক ও রাজনৈতিক সূচকসমূহ | সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও প্রফেশনাল খতিয়ান (২০২৬) |
| ডেনমার্কের মোট জনসংখ্যা | আনুমানিক ৬০ লাখ (৬ মিলিয়ন)। |
| বসবাসরত মুসলিম জনসংখ্যা | প্রায় ২ লক্ষ ৭০ হাজার (মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ)। |
| দেশটিতে সচল মোট মসজিদের সংখ্যা | সমগ্র ডেনমার্ক জুড়ে প্রায় ১০০টি মসজিদ রয়েছে। |
| সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক মসজিদ | ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অবস্থিত বিখ্যাত গ্র্যান্ড মস্ক। |
| গ্র্যান্ড মস্কের বর্তমান আইনি চুক্তি | স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে চুক্তির কারণে এই মসজিদ থেকে বাইরে কোনো আজান প্রচার করা হয় না। |
| আজান নিষিদ্ধের বর্তমান উদ্যোগ | অভিবাসন মন্ত্রী মর্টেন বডসকভের অধীনে এটি ডেনমার্কে ৩য় দফার প্রচেষ্টা। |
| বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক পরিচয় | ৪টি দলের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ ‘ফোর-লিফ ক্লোভার’ জোট সরকার। |
## ‘ফোর-লিফ ক্লোভার’ জোট সরকারের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এবং আগাম নির্বাচনের নেপথ্য কারণ
ডেনমার্কের বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপট অত্যন্ত জটিল ও নাটকীয়। গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত ডেনমার্কের সাধারণ নির্বাচনে কোনো একক দল সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে পর্দার আড়ালে তীব্র ও জটিল রাজনৈতিক ও কৌশলগত জোট আলোচনার পর, চলতি জুনে পুনরায় দেশের প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসনে বসেন মেটে ফ্রেডেরিকসেন। তিনি মূলত নিজের চরমপন্থী নীতিকে টিকিয়ে রাখতে মধ্যপন্থী মডারেটস (Moderates), বামপন্থী সোশ্যাল লিবারেলস (Social Liberals) এবং গ্রিন লেফট (Green Left)-এর সঙ্গে মিলে একটি চারদলীয় শক্তিশালী জোট সরকার গঠন করেছেন। ডেনমার্কের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই বিশেষ জোটটি ‘ফোর-লিফ ক্লোভার’ (Four-Leaf Clover) জোট নামে নতুন পরিচিতি পেয়েছে। এই জোটটি সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য আবার ‘রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্স’ নামক একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী পরিবেশ-সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পরোক্ষ সমর্থনের ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইউএনওর কাছে গুরুতর অভিযোগ
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ডেনমার্কে হঠাৎ কেন এই আগাম নির্বাচন ডাকতে হয়েছিল? এর পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক পরাশক্তি আমেরিকার সাথে এক সুগভীর কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব। আমেরিকার সাবেক ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ডেনমার্কের অত্যন্ত কৌশলগত ও খনিজ সমৃদ্ধ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে (Greenland) আমেরিকার নামে কিনে নেওয়ার বা এর ওপর মার্কিন সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে বারবার হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন ডেনমার্কের জাতীয় সার্বভৌমত্ব চরম হুমকির মুখে পড়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই আগ্রাসী ও ঔপনিবেশিক হুমকির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত শক্ত, আপসহীন ও শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করতে এবং দেশের মানুষের কাছ থেকে একটি নতুন ও শক্তিশালী রাজনৈতিক ম্যান্ডেট বা রায় আদায় করতেই মূলত গত মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন নির্ধারিত সময়ের আগেই এই আগাম নির্বাচন ডেকেছিলেন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে এখন তারা নিজেদের দেশের ভেতরের মুসলিম ও অভিবাসীদের ওপর এই নতুন কট্টর আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ইউরোপের বুকে ইসলাম ও মুসলিমদের ভবিষ্যৎ অবস্থান, ডেনমার্কের এই আজান বিরোধী আইনের আইনি লড়াইয়ের সর্বশেষ আপডেট, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্ব রাজনীতির আনাচে-কানাচে ঘটে যাওয়া প্রতিটি খবরের প্রфেশনাল ও শতভাগ ইউনিক বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।